A Top Ads

এক সময়ের লজিং মাস্টার মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একাধিক বাড়ি, গাড়ি,অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। শতকোটি টাকার মালিক ওই লজিং মাষ্টারের নাম খোরশেদ আলম। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াআটি মুক্তিনগর এলাকার বাসিন্দা। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তিন নাম্বার ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি। তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়নগঞ্জ দুদক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের রসুলবাগ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের ১৯৮৫-৮৬ সালে মনোয়ারা জুট মিলের সামান্য কেরানি হিসেবে দেড় হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতেন খোরশেদ আলম। মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কয়েক মাস বেকার থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের সিআইখোলা এলাকায় ঢাকা লাইমস ও যমুনা লাইমস নামে দুটি চুনা কারখানার ব্যবসা শুরু করেন।

সেই থেকে তার পথ চলা আর কখনো থেমে থাকেনি। অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কয়েকমাস পূর্বে তার মেঘনা ও যমুনা লাইমসে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জরিমান করেন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ডিষ্টিবিউশন কোম্পানী কর্র্তৃপক্ষ।

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আবাসিক এলাকায় চুনা কারখানা গড়ে তুলে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন তিনি। এছাড়াও আবাসিক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চুনাভাট্টি পরিচালনার অভিযোগে প্রায় তিন বছর যাবৎ পরিবেশের ছাড়পত্র না পেয়েই প্রতিষ্ঠান দুটো পরিচালনা করছেন তিনি। আওয়ামীলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে তিনি এসকল অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, রসুলবাগ এলাকায় শিমড়াইল মৌজায় ১১৩ দাগের বারো শতাংশ জমির ওপর প্রায় পনেরো কোটি টাকা ব্যয়ে দশতলা আলীশান ভবন, একই এলাকায় আল মদিনা মহিলা মাদরাসা সংলগ্ন প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের দশ কাঠা জমির ওপর টিনশেড ভবন, নয়াআঁটি এলাকায় ছয় কাঠা জমির ওপর পাশাপাশি দুটি পাঁচতলা ভবন, যার আনুমানিক মূল্য আট কোটি টাকা, রাজধানীর বাড্ডা ও মিরপুর এলাকায় দুটি ভবন রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি টাকা, ওয়ারী এলাকায় রয়েছে দুই হাজার পাঁচশত স্কয়ারফুটের দুটি ফ্ল্যাট, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকা, সিদ্ধিরগঞ্জের সিআইখোলা এলাকায় প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর ঢাকা ও যমুনা লাইমস নামে দুটি চুনা কারখানা, যার আনুমানিক মূল্য ৩০ কোটি টাকা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নতুন মডেলের প্রায় চার থেকে পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য পাঁচ কোটি টাকা।

এ ছাড়া নামে-বেনামে বিভিন্ন এলাকায় জমাজমি, বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা মজুদ রয়েছে তার। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সামান্য কেরানি থেকে কিভাবে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন তার সম্পদের হিসাব দেখলে বেরিয়ে আসবে মূল তথ্য।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানাযায়, চাঁদপুর এলাকা থেকে অন্নের সন্ধানে খোরশেদ মিয়া চিটাগাংরোড মিনার মসজিদ সংলগ্ন মান্নার মিয়ার ভাড়া বাসায় লজিং মাস্টার হিসেবে থাকতেন। পরে পেটের দায়ে শিমড়াইল মোড় এলাকায় আদমজী রোডরে মাথায় চা দোকানের কাজও করেছেন তিনি। পরে মনোয়ারা জুট মিলে কেরানি হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৮৪ সালে মাত্র পয়ত্রিশ হাজার টাকা চালান নিয়ে যৌথ মালিকানায় খাজা লাইমস নামে একটি চুনা কারখানার ব্যবসা শুরু করেন।

কিছুদিন যেতে না যেতেই তার ব্যবসায়িক পার্টনার তাকে চুরির দায়ে ওই চুনা কারখানা থেকে বিতারিত করেন। তারপর ভাই ভাই লাইমস নামে একক মালিকানায় চুনা কারখানার গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৯০ সালে পরবর্তীতে সুরমা ও ঢাকা লাইমস নামে দুটি কারখানা গড়ে তোলেন খোরশেদ আলম। পরে কয়েক বছরের ব্যবধানে অবৈধভাবে গ্যাস চুরি করে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন খোরশেদ।

আদর্শনগর এলাকার বাসিন্দা ফরমান আলী জানান, এক সময়ের পেটের দায়ে চা বিক্রি থেকে শুরু করে অনেক কাজ করেছেন খোরশেদ মিয়া। কয়েক বছরের ব্যবধানে সে আজ সমাজের বিত্তশালী হিসিবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

মুক্তিনগর এলাকার এক বাসিন্দা রহিমা আক্তার জানান,’আরে বাবা, খোরশেদ একসময় লজিং মাস্টার ছিল, ভাত খাইতে ভাত পাইত না। সে নাহি এহন অনেক বাড়ি-গাড়ির মালিক, গাড়িত কইরা চলে। কিভাবে কী হইলো কিছুই বুঝবার পারলাম না।

শিমড়াইল এলাকার বাসিন্দা আক্কাস আলী জানান, মাত্র কয়েক বছরেই খোরশেদ এত টাকার মালিক কিভাবে বনে গেল আমরা এলাকাবাসী অবাক হয়েই গেলাম। শুনছি ওর চুনা কারখানার গ্যাস চুরি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েই সে এই টাকার পাহাড় বানাইছে।

সিআইখোলা এলাকার বাসিন্দা আফজাল মিয়া জানান, সিটি কর্পোরেশনের রাস্তার উপর চুনা পাথর ফেলে স্তুপ করে ঘনবসতিপূর্ন এলাকায় চুনাভাট্টি পরিচালনা করছেন খোরশেদ মিয়া। সড়ক বন্ধ করে ব্যবসা পরিচালনা করায় আসা যাওয়ায় অনেক কষ্ট হয় এলাকাবাসীর।

এ বিষয়ে খোরশেদ ওরফে চুনা খোরশেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, একজন লজিং মাস্টার থেকে কিভাবে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি জীবনে অনেক চড়াই উৎড়াই পার করে, কষ্ট করে সম্পদের মালিক হয়েছি। অবৈধভাবে কোন সম্পদের মালিক হয়নি আমি।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান জানান, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অবৈধভাবে গ্যাস চুরি করে ব্যবসা পরিচালনা করে, তার দায়ভার আমরা নেব না। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আমরা সুপারিশ করব।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিষ্টিবিউশন নারায়ণগঞ্জ শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানাজার (ডিজিএম) মামুনুর রশিদ কালের কন্ঠকে জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের যমুনা ও ঢাকা লাইমস চুৃনা ভাট্টিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ স্থাপন করায় কয়েকবার লাইন কেটে বার্নার উদ্ধার করে ওই কারখানা দুটোর মালিক খোরশেদ মিয়া কে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, আবাসিক এলাকায় চুনাভাট্টি পরিচালনা করায় তাদের ছাড়পত্র নবায়ন করা হচ্ছে না। তাদের কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে ইতিমধ্যে তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা দূর্নীতি দমন কমিশন দুদক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, খোরশেদ ওরফে চুনা খোরশেদের সম্পদের বিষয়ে আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা করা হবে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক জনান, কয়েক বছরের ব্যবধানে একজন চুনা ব্যবসায়ী কিভাবে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক তানভীর মাহমুদ পাশা জানান, অবৈধ গ্যাস চুরি করে কেউ যদি অবৈধভাবে সম্পদের অর্জন করে থাকে তাহলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হবে।

 

সুত্র: কালের কন্ঠ

আগের সংবাদ দেখুনবস্তাবন্দি লাশের রহস্য উদঘাটন করলেন পিবিআই
পরের সংবাদ দেখুনফেন্সিডিলসহ ইউপি সদস্য গ্রেফতার